দারিদ্র্য দূর করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্নে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন মহেশখালী, কক্সবাজার, বান্দরবান, ফেনী, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য এলাকার অসংখ্য গরিব ও শ্রমজীবী মানুষ।
ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় কেউ গরু বিক্রি করেছেন, কেউ বন্ধক রেখেছেন জমি, কেউ আবার এনজিও থেকে উচ্চসুদে ঋণ নিয়েছেন। দালালচক্রের সহজ ভিসা-লোভনীয় বেতনের চাকরি-এক মাসের মধ্যে ফ্লাইট এমন মিষ্টি কথায় বিশ্বাস করে তারা আজ সকলেই নিঃস্ব। তাদের বিদেশ যাওয়ার বহু বছরের জমে থাকা স্বপ্ন ভেঙে গেছে মুহূর্তেই। সেই স্বপ্নই এখন সবাইকে কাঁদাচ্ছে।
জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও ইউরোপের স্বপ্ন দেখিয়ে হাফেজ মোস্তফার (২৯) দালালচক্র তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে লাখ লাখ টাকা। মোস্তাফা কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার শাপলাপুর ইউনিয়নের মিঠাছড়ির (৩নং ওয়ার্ড) নুর হোসেনের ছেলে। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলায় একটি মাদ্রাসায় চাকরি করছেন বলে জানা গেছে।
মহেশখালীর শাপলাপুরের একাধিক ভুক্তভোগীর সাথে কথা বলে জানা যায়, মোস্তাফা নিজেকে হাফেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক পরিচয় দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করতেন। এরপর মালয়েশিয়ার বিভিন্ন কোম্পানিতে উচ্চ বেতনের চাকরির নিশ্চয়তা দিয়ে ২ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত নিতেন। টাকা নেওয়ার সময় ভুক্তভোগীদের বিশ্বাস অর্জন করতে তাদেরকে একটি করে ভুয়া স্বাক্ষর করা স্ট্যাম্প দিতেন। আবার কয়েকজনকে নিজের স্বাক্ষর করা স্ট্যাম্পও দিয়েছেন। অনেককে ভিসা রেডি বলে কাগজ দেখালেও, কয়েক মাস পর জানা যায় সব কাগজই ভুয়া বা অকার্যকর। এখন মোস্তাফা নিজের এলাকা ছেড়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন।
ভুক্তভোগী জাকারিয়া (৩৩), মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের মিঠাছড়ি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা বলে দালাল মোস্তফাকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম।মেডিকেল দেওয়ার কথা বলে আমাদের চট্টগ্রামেও নিয়েগিয়েছিল। কিন্তু মেডিকেলের কোন ডকুমেন্ট দেয়নি। পরে ভিসা হবে একথা বলে বলে আমাকে ছয় মাস ঘোরালো। পরে জানতে পারি সে কোনো কাগজই জমা দেয়নি। এখন তিনি এলাকায় নেই। জমিটা বন্ধক রেখে তারে টাকা দিয়েছিলাম।
একই অভিজ্ঞতা রিয়াদ (২৮) নামের এক যবকেরও। তিনি উপজেলার মৌলভীকাটা গ্রামের বাসিন্দা আব্দু রহিমের ছেলে। তিনি জানান, মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কথা বলে ২ দফায় ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা নিলেও এখন পর্যন্ত টিকিট-ভিসা কিছুই দেখাতে পারেনি মোস্তফা ও তার দালালচক্র। পরিবারের অভাব দূর করার কথা ভেবে বিদেশ যাওয়ার প্ল্যান করেছিলাম। মোস্তফার প্রতারণায় সবকিছু শেষ হয়ে গেল আমার। টাকা দিয়েছি আজ প্রায় দেড় বছর হচ্ছে। এখন তিনি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আমাদের অনেকের পাসপোর্টও জিম্মি করে রেখেছেন। টাকা ফেরত চাইলে আজকে কালকে দিবে বলে ঘুরাচ্ছে।
মোস্তফার কাছে এমন প্রতারণার শিকার আরও বহু পরিবার। যার মধ্যে চট্টগ্রামের অনেক লোকজন রয়েছেন। তারা ইতিমধ্যে মামলা করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন বলেও প্রতিবেদককে জানান।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, মোস্তাফা একটি দালালচক্রের হয়ে কাজ করতেন। তারা গ্রামের গরিব মানুষদের টার্গেট করে ভিসা রেডি, ফ্লাইট নিশ্চিত এমন ধরনের কথা বলে প্রলোভন দেখাতো। কেউ টাকা দিতে অস্বীকার করলে ভুয়া এজেন্সির কার্ড দেখিয়ে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করতেন। এদের পেছনে একটি বড় দালাল চক্র সক্রিয়, যারা বিভিন্ন গ্রামে ‘দেশে-বিদেশে লোক পাঠানোর গ্যারান্টি দিয়ে’ সক্রিয়ভাবে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব দালালচক্র দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় কাজ করছেন। এই দালাল চক্রের সাথে হাফেজ মোস্তাফাও কাজ করছেন অনেক দিন ধরে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না হলে আগামী দিনগুলোতে আরো বহু পরিবার একইভাবে সর্বস্বান্ত হবে।
এ বিষয়ে হাফেজ মোস্তফার কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তবে প্রশ্নের মুখে একপর্যায়ে সবকিছু স্বীকার করে তিনি বলেন, আমি গার্ডিয়ান হয়ে মালয়েশিয়ার ভিসা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে শাপলাপুরের কিছু লোকের কাজ থেকে টাকা নিয়েছিলাম। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এজেন্সির মালিক পলাতক হয়ে যায়। তাই আর তাদের ভিসা দিতে পারিনি। পাওনাদারদের চাপের কারণে আমি নিজের পক্ষ থেকে প্রায় এক লাখ টাকার মতো ফেরতও দিয়েছি। ধীরে ধীরে বাকি টাকাও দিয়ে দেব।
ভুক্তভোগীরা তার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন- এমন প্রশ্নে মোস্তফা বলেন, আমার বিরুদ্ধে মামলা করবে কীভাবে? আমি গার্ডিয়ান হয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু কাউকে কোনো ডকুমেন্ট দিইনি। যাদের কয়েকজনকে স্ট্যাম্প দিয়েছি তারা আমার আত্মীয়। তারা কখনোই আমার বিরুদ্ধে মামলা করবে না। আর অন্যদের কাছে যে স্ট্যাম্প আছে, সেগুলো আসলে এজেন্সির মালিকের।
এ বিষয়ে মহেশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মঞ্জুরুল হক বলেন, এ ধরনের প্রতারণা বড় অপরাধ। আমরা দালালচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছি। অনুমোদনহীন দালালদের মাধ্যমে বিদেশ যেতে চাইলে এ ধরনের প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি খুব বেশি। যেকোনো অভিযোগ আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছি। লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভুক্তভোগীরা দ্রুত মোস্তাফিজকে গ্রেপ্তার করে টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষায়, মালয়েশিয়া যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে আমাদের পকেট খালি করেছে। এখন ন্যায়বিচার ছাড়া আর কিছুই চাই না।

প্রকাশের তারিখ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫
দারিদ্র্য দূর করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্নে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন মহেশখালী, কক্সবাজার, বান্দরবান, ফেনী, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য এলাকার অসংখ্য গরিব ও শ্রমজীবী মানুষ।
ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় কেউ গরু বিক্রি করেছেন, কেউ বন্ধক রেখেছেন জমি, কেউ আবার এনজিও থেকে উচ্চসুদে ঋণ নিয়েছেন। দালালচক্রের সহজ ভিসা-লোভনীয় বেতনের চাকরি-এক মাসের মধ্যে ফ্লাইট এমন মিষ্টি কথায় বিশ্বাস করে তারা আজ সকলেই নিঃস্ব। তাদের বিদেশ যাওয়ার বহু বছরের জমে থাকা স্বপ্ন ভেঙে গেছে মুহূর্তেই। সেই স্বপ্নই এখন সবাইকে কাঁদাচ্ছে।
জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও ইউরোপের স্বপ্ন দেখিয়ে হাফেজ মোস্তফার (২৯) দালালচক্র তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে লাখ লাখ টাকা। মোস্তাফা কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার শাপলাপুর ইউনিয়নের মিঠাছড়ির (৩নং ওয়ার্ড) নুর হোসেনের ছেলে। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলায় একটি মাদ্রাসায় চাকরি করছেন বলে জানা গেছে।
মহেশখালীর শাপলাপুরের একাধিক ভুক্তভোগীর সাথে কথা বলে জানা যায়, মোস্তাফা নিজেকে হাফেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক পরিচয় দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করতেন। এরপর মালয়েশিয়ার বিভিন্ন কোম্পানিতে উচ্চ বেতনের চাকরির নিশ্চয়তা দিয়ে ২ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত নিতেন। টাকা নেওয়ার সময় ভুক্তভোগীদের বিশ্বাস অর্জন করতে তাদেরকে একটি করে ভুয়া স্বাক্ষর করা স্ট্যাম্প দিতেন। আবার কয়েকজনকে নিজের স্বাক্ষর করা স্ট্যাম্পও দিয়েছেন। অনেককে ভিসা রেডি বলে কাগজ দেখালেও, কয়েক মাস পর জানা যায় সব কাগজই ভুয়া বা অকার্যকর। এখন মোস্তাফা নিজের এলাকা ছেড়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন।
ভুক্তভোগী জাকারিয়া (৩৩), মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের মিঠাছড়ি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা বলে দালাল মোস্তফাকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম।মেডিকেল দেওয়ার কথা বলে আমাদের চট্টগ্রামেও নিয়েগিয়েছিল। কিন্তু মেডিকেলের কোন ডকুমেন্ট দেয়নি। পরে ভিসা হবে একথা বলে বলে আমাকে ছয় মাস ঘোরালো। পরে জানতে পারি সে কোনো কাগজই জমা দেয়নি। এখন তিনি এলাকায় নেই। জমিটা বন্ধক রেখে তারে টাকা দিয়েছিলাম।
একই অভিজ্ঞতা রিয়াদ (২৮) নামের এক যবকেরও। তিনি উপজেলার মৌলভীকাটা গ্রামের বাসিন্দা আব্দু রহিমের ছেলে। তিনি জানান, মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কথা বলে ২ দফায় ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা নিলেও এখন পর্যন্ত টিকিট-ভিসা কিছুই দেখাতে পারেনি মোস্তফা ও তার দালালচক্র। পরিবারের অভাব দূর করার কথা ভেবে বিদেশ যাওয়ার প্ল্যান করেছিলাম। মোস্তফার প্রতারণায় সবকিছু শেষ হয়ে গেল আমার। টাকা দিয়েছি আজ প্রায় দেড় বছর হচ্ছে। এখন তিনি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আমাদের অনেকের পাসপোর্টও জিম্মি করে রেখেছেন। টাকা ফেরত চাইলে আজকে কালকে দিবে বলে ঘুরাচ্ছে।
মোস্তফার কাছে এমন প্রতারণার শিকার আরও বহু পরিবার। যার মধ্যে চট্টগ্রামের অনেক লোকজন রয়েছেন। তারা ইতিমধ্যে মামলা করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন বলেও প্রতিবেদককে জানান।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, মোস্তাফা একটি দালালচক্রের হয়ে কাজ করতেন। তারা গ্রামের গরিব মানুষদের টার্গেট করে ভিসা রেডি, ফ্লাইট নিশ্চিত এমন ধরনের কথা বলে প্রলোভন দেখাতো। কেউ টাকা দিতে অস্বীকার করলে ভুয়া এজেন্সির কার্ড দেখিয়ে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করতেন। এদের পেছনে একটি বড় দালাল চক্র সক্রিয়, যারা বিভিন্ন গ্রামে ‘দেশে-বিদেশে লোক পাঠানোর গ্যারান্টি দিয়ে’ সক্রিয়ভাবে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব দালালচক্র দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় কাজ করছেন। এই দালাল চক্রের সাথে হাফেজ মোস্তাফাও কাজ করছেন অনেক দিন ধরে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না হলে আগামী দিনগুলোতে আরো বহু পরিবার একইভাবে সর্বস্বান্ত হবে।
এ বিষয়ে হাফেজ মোস্তফার কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তবে প্রশ্নের মুখে একপর্যায়ে সবকিছু স্বীকার করে তিনি বলেন, আমি গার্ডিয়ান হয়ে মালয়েশিয়ার ভিসা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে শাপলাপুরের কিছু লোকের কাজ থেকে টাকা নিয়েছিলাম। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এজেন্সির মালিক পলাতক হয়ে যায়। তাই আর তাদের ভিসা দিতে পারিনি। পাওনাদারদের চাপের কারণে আমি নিজের পক্ষ থেকে প্রায় এক লাখ টাকার মতো ফেরতও দিয়েছি। ধীরে ধীরে বাকি টাকাও দিয়ে দেব।
ভুক্তভোগীরা তার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন- এমন প্রশ্নে মোস্তফা বলেন, আমার বিরুদ্ধে মামলা করবে কীভাবে? আমি গার্ডিয়ান হয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু কাউকে কোনো ডকুমেন্ট দিইনি। যাদের কয়েকজনকে স্ট্যাম্প দিয়েছি তারা আমার আত্মীয়। তারা কখনোই আমার বিরুদ্ধে মামলা করবে না। আর অন্যদের কাছে যে স্ট্যাম্প আছে, সেগুলো আসলে এজেন্সির মালিকের।
এ বিষয়ে মহেশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মঞ্জুরুল হক বলেন, এ ধরনের প্রতারণা বড় অপরাধ। আমরা দালালচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছি। অনুমোদনহীন দালালদের মাধ্যমে বিদেশ যেতে চাইলে এ ধরনের প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি খুব বেশি। যেকোনো অভিযোগ আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছি। লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভুক্তভোগীরা দ্রুত মোস্তাফিজকে গ্রেপ্তার করে টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষায়, মালয়েশিয়া যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে আমাদের পকেট খালি করেছে। এখন ন্যায়বিচার ছাড়া আর কিছুই চাই না।

আপনার মতামত লিখুন